আপডেট: September 17, 2026
অনলাইন ডেস্ক:::
জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদে পদায়নের জন্য যোগ্য প্রার্থী তালিকা বা ফিটলিস্ট তৈরিতে কর্মকর্তাদের মৌখিক পরীক্ষা (ভাইভা) নেওয়া হচ্ছে। এ জন্য প্রচলিত নিয়ম মেনে কোনো কর্মকর্তাকে চিঠি দেওয়া হয়নি। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়নি। টেলিফোনে ডেকেই সাক্ষাৎকার নেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, তদবির ও প্রভাব বিস্তার ঠেকাতে এভাবে সাক্ষাৎকার নেওয়া হচ্ছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ৩০তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের ডিসি পদে পদায়নের জন্য গত ৩০ আগস্ট থেকে তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। তালিকা প্রণয়নের জন্য গঠিত কমিটি তাদের সাক্ষাৎকার নিচ্ছে। সর্বশেষ রোববার অফিস ছুটির পর বিকেল ৪টায় ২০ জন কর্মকর্তার সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। এভাবে গত দেড় মাসে পর্যায়ক্রমে ১৪০ জন কর্মকর্তা সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। চলতি সপ্তাহে আরও প্রায় ১০ জন কর্মকর্তার সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠিত হবে। তবে সাক্ষাৎকারের জন্য কাউকেই আনুষ্ঠানিক চিঠি দেওয়া হয়নি।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট ও নোটিশ বোর্ডে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়নি। শুধু টেলিফোন করে ডেকে এনে ৩০তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে যাদের মাঠ প্রশাসনে কাজের অভিজ্ঞতা আছে তাদের ডিসি পদে নিয়োগের জন্য সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে।
প্রচলিত নিয়ম হলো, ডিসি ফিটলিস্ট তৈরির জন্য প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তাদের ব্যাচভিত্তিক সাক্ষাৎকার নিতে হবে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে নির্দিষ্ট তারিখ ও সময়ে চিঠি দিয়ে ডাকতে হবে। সাক্ষাৎকারের প্রস্তুতির জন্য সময়ও দেওয়া হবে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট ও নোটিশ বোর্ডে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে। পূর্বানুমতি ছাড়া কেউ অনুপস্থিত থাকতে পারবেন না। কিন্তু এবার এসব নিয়ম মানা হচ্ছে না। সর্বশেষ গত এপ্রিলে ডিসি ফিটলিস্ট তৈরির প্রথম উদ্যোগের সময়ও এসব নিয়মকানুন না মেনে তালিকা করা হয়েছিল। তখন বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ২৮ ও ২৯তম ব্যাচ থেকে কর্মকর্তাদের ডাকা হয়েছিল। তবে অনেক কর্মকর্তা বিষয়টি জানতে পারেননি। নিয়মানুযায়ী সব কর্মকর্তার এই সাক্ষাৎকারে ডাক পাওয়ার কথা।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ ও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মেধাতালিকার ক্রম অনুযায়ী সব কর্মকর্তাকে সাক্ষাৎকারের জন্য ডাকা হয়েছিল। এর মধ্যে যারা ঢাকার বাইরে গিয়ে ডিসির দায়িত্ব পালন করতে চাইতেন না, তারা কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে সাক্ষাৎকারে অনুপস্থিত ছিলেন, এমন নজির আছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিসি পদের নিয়োগ তালিকা প্রণয়ন কমিটির একজন সদস্য বলেন, ডিসি পদায়নের তালিকা তৈরির কাজ শুরু হলে অনেক তদবির হয়। এ জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ বা আনুষ্ঠানিক চিঠি না দিয়েই সাক্ষাৎকার নেওয়া হচ্ছে। বিজ্ঞপ্তি না দিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ফোনে ডেকে সাক্ষাৎকার নেওয়ায় তদবির কিছুটা কম হচ্ছে। তিনি বলেন, ডিসি শুধু সাক্ষাৎকার দিয়ে হয় না। আরও অনেক কিছুর প্রয়োজন আছে।
সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার সমকালকে বলেন, তদবিরের কারণে বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই সাক্ষাৎকার নেওয়া হচ্ছে এটা কোনো যুক্তি হতে পারে না। কারণ, প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছে এমন তদবির প্রথমত আসা উচিত না। দ্বিতীয়ত, ডিসি বানানোর তদবির এলে সে কথা শোনা যাবে না।
আবদুল আউয়াল মজুমদার আরও বলেন, যদি স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় তালিকা তৈরি করা হয় তাহলে কীভাবে সাক্ষাৎকার নেওয়া হলো সেটা বড় বিষয় নয়। বড় বিষয় হচ্ছে, স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ডিসি পদায়নের তালিকা তৈরি করা। অতীতে সাক্ষাৎকার ছাড়াও কিছু কর্মকর্তাকে ডিসি বানানো হয়েছে। কিন্তু সেটা ভালো হয়নি। এতে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে।
ডিসি হতে ইচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, এক ব্যাচ থেকে সবাই ডিসি হবেন না। সরকার যাকে পছন্দ করবে, তিনিই ডিসি হবেন। কিন্তু ফিটলিস্ট তৈরিতে সাক্ষাৎকার নিয়ে লুকোচুরি কেন? তারা বলেন, আগে কখনও এভাবে হয়নি। সরকার যত বেশি সম্ভব যাচাই-বাছাই করুক, করা উচিতও। এ জন্য বিভাগীয় কমিশনারদের মাধ্যমে অধিকতর যাচাই-বাছাই করার বিধানও আছে।
ছুটি ছাড়া কর্মস্থল ছেড়ে আসতে জটিলতা
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, কর্মস্থল থেকে ছুটি নিতে সরকারি কর্মকর্তাদের নির্ধারিত ছুটি বিধিমালা মেনে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমোদন নিতে হয়। জরুরি কোনো ছুটির জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ আবেদন জমা দিতে হয়। তাই কোনো জেলা থেকে ঢাকায় সাক্ষাৎকার দিতে এলে অবশ্যই চিঠির প্রয়োজন। চিঠি না দেওয়ায় কর্মস্থল থেকে ছুটি নিতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে ।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন কর্মচারীদের পদায়ন নীতিমালায় বলা আছে, ডিসি পদের নিয়োগ তালিকা প্রণয়নের জন্য একটি কমিটি গঠন করতে হবে। কমিটির সভাপতি হবেন মন্ত্রপরিষদ সচিব। সদস্য সচিব হবেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব। কমিটির সদস্য হবেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব ও ভূমি মন্ত্রণালয়ে সচিব।
কমিটির কার্যপরিধিতে বলা হয়েছে, কমিটি প্রয়োজনবোধে অতিরিক্ত সচিব বা যুগ্ম সচিব এবং বিভাগীয় কমিশনারদের সহায়তায় এক বা একাধিক বোর্ড গঠনের মাধ্যমে প্রার্থীর তথ্য ও প্রযুক্তিবিষয়ক দক্ষতা এবং বিষয়ভিত্তিক উপস্থাপনার দক্ষতা বা পারদর্শিতা যাচাই করবে। সাক্ষাৎকার এবং সাক্ষাৎকার গ্রহণকালে প্রার্থীর মেধা, প্রজ্ঞা, ব্যক্তিত্ব, স্বাস্থ্য, আগ্রহ, ভাষাজ্ঞান, বাচনভঙ্গি, উপস্থাপনার পারদর্শিতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং প্রয়োজনীয় অন্য যোগ্যতা যাচাই করতে হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাঠ প্রশাসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোর একটি হলো জেলা প্রশাসক। জেলা পর্যায়ে সরকারের নীতি বাস্তবায়ন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, ভূমি ব্যবস্থাপনা, উন্নয়ন কার্যক্রমসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন তারা। ফলে এ পদে পদায়নের ক্ষেত্রে দক্ষতা ও যোগ্যতার পাশাপাশি স্বচ্ছ প্রক্রিয়ারও গুরুত্বপূর্ণ।
মাঠ প্রশাসনের অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন
শর্ত শিথিল করে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক পদে কাজ না করলেও ডিসি হতে পারবেন বলে নিয়ম করেছিল সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার। এবার সেই শর্ত শিথিল করে সাক্ষাৎকারের জন্য কাউকে ডাকা হয়নি। এতে ৩০তম ব্যাচে প্রায় ২৫০ জন উপসচিব থাকলেও সাক্ষাৎকারে ডাকা হয়েছে ১৫০ জনকে।
সাক্ষাৎকারে ডাক না পাওয়া একাধিক কর্মকর্তা বলেন, যেহেতু শর্ত শিথিলের বিধান বাতিল করা হয়নি; তাই যাদের শর্ত পূরণ হয়নি বা মাঠ প্রশাসনে কাজের অভিজ্ঞতা কম আছে তাদেরও ডাকা উচিত ছিল।
কর্মচারী পদায়ন নীতিমালায় বলা আছে, ডিসি ফিটলিস্ট প্রণয়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক/এডিসি/জেলা পরিষদের সচিব/পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং ইউএনও উভয় পদে ন্যূনতম দুই বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। পূর্ববর্তী পাঁচ বছরের বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনের রেকর্ড এবং সমগ্র চাকরিজীবনের শৃঙ্খলা প্রতিবেদন সন্তোষজনক হতে হবে। প্রকল্প ও ক্রয় ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত জ্ঞান, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সম্পর্কে সম্যক ধারণা, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয় সম্পর্কে জানা এবং বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা থাকতে হবে। ম্যাজিস্ট্রেসি ও ভূমি ব্যবস্থাপনা বিষয়ে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন হতে হবে।






