আপডেট: October 1, 2026
অনলাইন ডেস্ক
ফ্লাইদুবাইয়ের একটি বিমানে সহ-পাইলটের ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত হয়েছিলেন ভারতীয় পাইলট স্মিত মাচ্ছার। প্রচুর রক্তক্ষরণে জ্ঞান হারানোর উপক্রম হলেও তিনি কোনওভাবে ককপিটের দরজা খুলে দেন এবং বিমানে থাকা ১৭৪ যাত্রীর জীবন রক্ষা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। পরে বিমানের এক যাত্রী ও পেশায় দন্ত চিকিৎসক জরুরি চিকিৎসা দিয়ে তার জীবন বাঁচাতে সহায়তা করেন।
ফ্লাইদুবাইয়ের ফ্লাইট এফজেড১০৭৩-তে ঘটে এই ভয়াবহ ঘটনা। ওমানি সহ-পাইলট বিমানটি বিধ্বস্ত করার চেষ্টা করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ সময় চার যাত্রী প্রথমে ককপিটের দিকে ছুটে যান। তাদের মধ্যে ছিলেন দন্ত চিকিৎসক মুসায়েভ শোটা। সন্দেহভাজন হামলাকারীকে পরাস্ত করে নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর আহত পাইলটের প্রাথমিক চিকিৎসা শুরু করেন তিনিই।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ইয়েনেটকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ঘটনার ভয়াবহতা বর্ণনা করতে গিয়ে শোটা বলেন, পরিস্থিতি বুঝতে পেরে তিনি এক মুহূর্তও অপেক্ষা করেননি।
“আমি অপেক্ষা করিনি। বুঝতে পারলাম কিছু একটা সমস্যা হয়েছে এবং দৌড়ে গেলাম,” -বলেন তিনি।
‘মাথা ও হাত প্রায় কেটে গিয়েছিল’
শোটা জানান, ককপিটে গিয়ে তিনি পাইলটকে অত্যন্ত গুরুতর অবস্থায় দেখতে পান। তার মাথা ও হাত থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছিল।
বিমানে তিনিই একমাত্র চিকিৎসক ছিলেন বলে জানান এই দন্ত চিকিৎসক। তার ভাষায়, তিনি দ্রুত রক্তক্ষরণ বন্ধ করার চেষ্টা করেন। এরপর অবতরণের কিছুক্ষণ আগ পর্যন্ত পাইলটের অবস্থা মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল। তবে অবতরণের ঠিক আগে তার শারীরিক অবস্থার কিছুটা অবনতি ঘটে।
সিএনএনকে শোটা আরও ভয়াবহ বর্ণনা দেন। তিনি বলেন, পাইলটের শরীরজুড়ে কাটা-ছেঁড়ার ক্ষত ছিল। তার মাথা ও হাতের আঘাত এতটাই গুরুতর ছিল যে সেগুলো ‘প্রায় দ্বিখণ্ডিত হয়ে যাওয়ার মতো’ দেখাচ্ছিল।
তিনি বলেন, পাইলটের অবস্থা গুরুতর ছিল। তবে তখনও সেটিকে সংকটজনক বলা যায়নি। মূল সমস্যা ছিল বিপুল রক্তক্ষরণ।
রক্তের মধ্যে শুয়েও কথা বলছিলেন পাইলট
এত গুরুতর আহত হওয়ার পরও পাইলট জ্ঞান হারাননি। বিমানের মেঝেতে নিজের রক্তের মধ্যে পড়ে থেকেও তিনি যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলছিলেন।
শোটা ইয়েনেটকে বলেন, পাইলট তাদের সঙ্গে কথা বলছিলেন এবং জানান তার বয়স ৩৯ বছর এবং তার দুই সন্তান রয়েছে। হামলাকারী তাকে ছুরিকাঘাত করার পাশাপাশি গালিগালাজও করেছিল বলে পাইলট তাদের জানান।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) দেওয়া বক্তব্যে শোটা বলেন, আহত পাইলট পুরো সময় প্রার্থনা করছিলেন এবং তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন। পাইলটকে হারানোর আশঙ্কায় তিনি নিজেও ভয় পাচ্ছিলেন।
শোটা বলেন, “সে পুরো সময় প্রার্থনা করছিল এবং আমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিল। আমি ভয় পাচ্ছিলাম, আমরা হয়তো সত্যিই তাকে হারিয়ে ফেলব।”
ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে বিমানের মেঝেতে রক্তাক্ত ও আহত দুই ব্যক্তিকে দেখা যায়।
সৌদি আরবে জরুরি অবতরণ
ঘটনার পর বিমানটি সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করে। সেখানে সৌদি চিকিৎসক দল আহত পাইলটের চিকিৎসার দায়িত্ব নেয়।
শোটা জানান, সৌদি চিকিৎসকদের কাছ থেকে তিনি বুঝতে পারেন যে, পাইলট বেঁচে গেছেন এবং তার অবস্থা আর আশঙ্কাজনক নেই।
এদিকে পাইলট স্মিত মাচ্ছারের শারীরিক অবস্থার ওপর নজর রাখছে সৌদি আরবে ভারতের দূতাবাস ও জেদ্দার ভারতীয় কনস্যুলেট।
রিয়াদে ভারতের দূতাবাস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সৌদি আরবে থাকা দুই ভারতীয় মিশনই ক্যাপ্টেন মাচ্ছারের চিকিৎসার বিষয়ে নিয়মিত খোঁজখবর রাখছে।
দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, উত্তর-পশ্চিম সৌদি আরবের তাবুক শহরের একটি হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন আহত ভারতীয় পাইলট। সেখানে তিনি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিচ্ছেন।
পাইলটের অবস্থা স্থিতিশীল
ভারতীয় দূতাবাস জানিয়েছে, পাইলটের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্যের অপেক্ষায় রয়েছে তারা। তবে প্রাথমিকভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী তার অবস্থা স্থিতিশীল।
এক বিবৃতিতে দূতাবাস বলেছে, তারা আশা করছে ক্যাপ্টেন মাচ্ছার দ্রুত আঘাত থেকে সুস্থ হয়ে উঠবেন।
পাইলটের পরিবারের সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে ভারতীয় মিশন। সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে তার চিকিৎসা ও পরিবারের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে দূতাবাস।
ভারতীয় দূতাবাসের ভাষায়, তারা ক্যাপ্টেন মাচ্ছারের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তার স্বাস্থ্যের বিষয়ে নিয়মিত যোগাযোগ অব্যাহত রাখবে। তার সুস্থতার জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা দেওয়ারও আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
বিমানের ভেতরে সহ-পাইলটের হামলার পরও ককপিটের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা এবং দরজা খুলে দেওয়ার মাধ্যমে ক্যাপ্টেন মাচ্ছার বড় ধরনের বিপর্যয় এড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন বলে প্রত্যক্ষদর্শী যাত্রীদের বর্ণনায় উঠে এসেছে। গুরুতর আহতাবস্থায়ও তার সচেতন থাকা এবং শেষ পর্যন্ত বিমানটিকে নিরাপদে জরুরি অবতরণে সহায়তা করার ঘটনাটি এখন ওই ফ্লাইটের সবচেয়ে আলোচিত দিক হয়ে উঠেছে।






