আপডেট: October 31, 2026
রিপোর্ট, বিডি ক্রাইম পেট্রোল::
দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী আবুল খায়ের গ্রুপে পারিবারিক ব্যবসার মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়েছে। প্রতিষ্ঠাতা পরিবারের চার ভাইয়ের মধ্যে অংশীদারি, ব্যবস্থাপনা এবং ব্যবসা সম্প্রসারণে অবদান নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে এখনো সম্পদ ভাগাভাগির সমঝোতা হয়নি। তবে আনুষ্ঠানিক বিভাজন না হলেও বাস্তবে আলাদা পথে এগোচ্ছেন তাঁরা। গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল কাশেম নিজের উদ্যোগে নতুন ব্যবসা সম্প্রসারণ করছেন। অন্যদিকে তাঁর তিন ভাই পরিচালনা করছেন গ্রুপের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসাগুলো।
ব্যাংকার ও শিল্প খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্য অনুযায়ী, বছরে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা করা এই শিল্পগোষ্ঠীর চার ভাই নীতিগতভাবে সমান মালিকানায় সম্মত হয়েছেন। প্রত্যেকের অংশ প্রায় ২৫ শতাংশ। তবে কোন ভাই কোন প্রতিষ্ঠান বা সম্পদের দায়িত্ব নেবেন, তা নিয়ে সমঝোতা হয়নি।
প্রয়াত আবুল খায়েরের বড় ছেলে আবুল কাশেম স্মাইল ফুড প্রোডাক্টসের মাধ্যমে খাদ্যপণ্যের ব্যবসা সম্প্রসারণ করছেন। সম্প্রতি তিনি ইগলু সুগার নামে পরিচিত আবদুল মোনেম সুগার রিফাইনারি এবং গ্লোব ফার্মাসিউটিক্যালসের ভোজ্যতেল ব্যবসা অধিগ্রহণ করেছেন। শিল্প খাতের সূত্রের হিসাবে, এ দুটি অধিগ্রহণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে গ্রুপের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু সাঈদ চৌধুরী ও তাঁর দুই ভাই শাহ সিমেন্ট, একেএস স্টিল, মার্কস ফুল ক্রিম মিল্ক পাউডার, সিলন টি ও স্টারশিপ কনডেন্সড মিল্কসহ প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ডগুলোর ব্যবসা পরিচালনা করছেন। ব্যাংকারদের ভাষ্য, আবুল কাশেম চেয়ারম্যান থাকলেও দৈনন্দিন ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তে তাঁর সম্পৃক্ততা কমে গেছে। তাঁর সাম্প্রতিক কিছু অধিগ্রহণও পারিবারিক গ্রুপের সম্মিলিত মালিকানায় নয়, ব্যক্তিগত অংশের বিপরীতে হচ্ছে।
ছোট ব্যবসা থেকে শিল্পগোষ্ঠী : ১৯৭৬ সালে আবুল খায়ের মারা যাওয়ার সময় তাঁর বড় ছেলে আবুল কাশেম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের ব্যবসার দায়িত্ব নেওয়ার পাশাপাশি সাত ছোট ভাইবোনের দেখাশোনার দায়িত্বও তাঁর ওপর পড়ে।
তখন পরিবারের ব্যবসার মধ্যে ছিল চারটি বিড়ি কারখানা, একটি ইটভাটা, একটি সিনেমা হল, চট্টগ্রামের জেল রোডে একটি ট্রেডিং ব্যবসা এবং কিছু জমি। পরবর্তী সময়ে ছোট ভাইদের ব্যবসায় যুক্ত করেন কাশেম এবং ধীরে ধীরে তাঁদের হাতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তুলে দেন। ১৯৯৩ সালে ঢেউটিন উৎপাদনের ব্যবসায় প্রবেশের মধ্য দিয়ে আবুল খায়ের গ্রুপের শিল্প সম্প্রসারণ শুরু হয়। ‘গরু মার্কা ঢেউটিন’ ব্র্যান্ডটি বাজারে জনপ্রিয়তা পায়। এরপর ২০০২ সালে সিমেন্ট ব্যবসায় প্রবেশ করে গ্রুপটি। পরবর্তী সময়ে ইস্পাত, দুগ্ধজাত পণ্য ও ভোগ্যপণ্যের ব্যবসায় সম্প্রসারণ ঘটে। গড়ে ওঠে শাহ সিমেন্ট, একেএস স্টিল, মার্কস, সিলন টি ও স্টারশিপের মতো পরিচিত ব্র্যান্ড। তবে ২০০৩ সালে কাশেমের এক ভাইয়ের আকস্মিক মৃত্যুর পর পারিবারিক ব্যবসার নেতৃত্বে পরিবর্তন আসে। একপর্যায়ে কাশেম ব্যবসা থেকে নিজেকে অনেকটা সরিয়ে নেন। এ সময় তাঁর অন্য ভাইয়েরা ব্যবসার দায়িত্ব নিয়ে গ্রুপের সম্প্রসারণ অব্যাহত রাখেন।
অবদান ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ : সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, ২০২২ সালের দিকে কাশেম আবার ব্যবসায় সক্রিয় হন। এরপর পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মের অংশগ্রহণ ও ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মতবিরোধ দেখা দেয়। গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তির ভাষ্য, কাশেম মনে করেন, তাঁর ছেলেকে ব্যবসায় যথাযথ দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। অন্যদিকে পরিবারের অন্য সদস্যদের যুক্তি, কাশেম যখন ব্যবসা থেকে সরে দাঁড়ান, তখন গ্রুপের আকার বর্তমানের তুলনায় অনেক ছোট ছিল। পরবর্তী সময়ে তাঁদের নেতৃত্বেই বড় বিনিয়োগ, ঝুঁকি গ্রহণ ও ব্যবসার সম্প্রসারণ হয়েছে। সমঝোতার উদ্যোগে যুক্ত এক ব্যাংকারের মতে, বর্তমান ব্যবসার প্রবৃদ্ধিতে যাঁরা নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাঁরা নিজেদের অবদানের স্বীকৃতি চান। অন্যদিকে কাশেম মনে করেন, পারিবারিক ব্যবসার ভিত্তি গড়ে তোলা এবং ছোট ভাইদের প্রতিষ্ঠিত করতে তাঁর দীর্ঘদিনের অবদানও মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় যথাযথভাবে বিবেচনা করা উচিত। এ বিরোধ মেটাতে ২০২৫ সালে কয়েকজন ব্যাংকার মধ্যস্থতার উদ্যোগ নেন। তাঁদের প্রস্তাব ছিল, গ্রুপের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ও ব্যবসার মূল্য নির্ধারণ করে চার ভাইয়ের মালিকানার অনুপাত অনুযায়ী ভাগ করে দেওয়া। যেমন-কোনো প্রতিষ্ঠানের মূল্য ১০০ কোটি টাকা হলে ২৫ শতাংশ মালিকানার অধিকারী একজন ভাই ২৫ কোটি টাকা মূল্যের সম্পদ পাবেন। প্রথম দিকে উদ্যোগটিতে অগ্রগতি হলেও সম্পদ বণ্টনের পদ্ধতি নিয়ে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে মতৈক্য হয়নি। ফলে আলোচনা থেমে যায় এবং মধ্যস্থতাকারী ব্যাংকাররাও সরে দাঁড়ান। পরিবারটি আইনজীবীদের সঙ্গে আলোচনা করে আইনি পদক্ষেপের বিষয়টিও বিবেচনা করেছে। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকারদের তথ্য অনুযায়ী, তখন পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি।
চেয়ারম্যানের চিঠি, ব্যাংকের কার্যক্রম স্বাভাবিক : মালিকানা নিয়ে বিরোধ থাকলেও আবুল কাশেম এখনো গ্রুপের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান। তবে ব্যাংকারদের দাবি, মূল ব্যবসাগুলোর সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন তাঁর তিন ভাই। একজন ব্যাংকার জানান, কয়েক মাস আগে কাশেম ব্যাংকগুলোকে চিঠি দিয়ে তাঁর সম্পৃক্ততা ছাড়া পরিচালনা পর্ষদের কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। তবে ব্যাংকগুলো আগের নিয়মেই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। কারণ, গ্রুপের বিদ্যমান ব্যবস্থাপনায় যেকোনো দুজন পরিচালকের স্বাক্ষর করা সিদ্ধান্ত কার্যকর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ব্যাংকারদের মতে, পারিবারিক বিরোধ থাকলেও গ্রুপের প্রধান ব্যবসাগুলো স্বাভাবিকভাবে চলছে এবং ব্যাংকের ঋণ ও অন্যান্য দায় নিয়মিত পরিশোধ করা হচ্ছে। এ বিষয়ে আবুল খায়ের গ্রুপের বক্তব্য জানতে চাওয়া হলেও গ্রুপের কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
নতুন ব্যবসায় বড় বিনিয়োগ কাশেমের : পারিবারিক ব্যবসার ভাগাভাগি নিয়ে সমঝোতা না হলেও নিজের ব্যবসায়িক পরিসর বাড়াচ্ছেন আবুল কাশেম। স্মাইল ফুড প্রোডাক্টসের মাধ্যমে খাদ্যপণ্যের ব্যবসা সম্প্রসারণের পাশাপাশি নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণ করছেন তিনি। শিল্প খাতের সূত্র জানায়, আবদুল মোনেম সুগার রিফাইনারি কিনতে তিনি অন্তত ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা এবং গ্লোব এডিবল অয়েলের ব্যবসা অধিগ্রহণে ২ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় করেছেন। এর সঙ্গে ঢাকার তেজগাঁও শিল্প এলাকায় কয়েক একর জমিও রয়েছে। এ ছাড়া খাদ্যপণ্য, পানীয় ও বিস্কুট খাতের আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণের আলোচনা চলছে। মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ায় হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চলে সিটি গ্রুপের কয়েকটি প্রকল্প কেনার আগ্রহও রয়েছে তাঁর। ওই অর্থনৈতিক অঞ্চলে কাগজ, সিমেন্ট, সিরামিক, রাসায়নিক ও জাহাজ নির্মাণসহ ছয়টি বড় শিল্প ও অবকাঠামো প্রকল্প রয়েছে। আর্থিক সংকটের কারণে এসব সম্পদের কিছু বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে সিটি গ্রুপ। সংশ্লিষ্ট এক ব্যাংকারের ভাষ্য, আনুষ্ঠানিকভাবে পারিবারিক ব্যবসা ভাগ না হলেও বাস্তবে দুই পক্ষের ব্যবসায়িক কার্যক্রম আলাদা হয়ে যাচ্ছে। আবুল কাশেম নিজের নতুন উদ্যোগগুলো পরিচালনা করছেন। অন্যদিকে তাঁর তিন ভাই আবুল খায়ের গ্রুপের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসাগুলোর দায়িত্বে রয়েছেন। কয়েক দশক ধরে একসঙ্গে গড়ে ওঠা পারিবারিক শিল্পগোষ্ঠীতে এভাবে পৃথক ব্যবসায়িক বলয় তৈরি হলেও ৫০ হাজার কোটি টাকার সম্পদ ও ব্যবসার চূড়ান্ত মালিকানা কীভাবে বণ্টন হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।






