বরগুনায় শিক্ষার্থীদের অভাব : ক্লাশে ঘুমোচ্ছেন শিক্ষকরা . .

আপডেট: October 31, 2026

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন

 বরগুনা প্রতিনিধি
আধুনিক ভবন, একাধিক শিক্ষক– সবই আছে। নেই শুধু পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী। ফলে শিক্ষকদের অনেকেই নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসেন না। যারা আসেন তারাও অলস সময় কাটান। কেউবা দুপুরের ভাতঘুমটা দেন বিদ্যালয়েই। এই চিত্র বরগুনার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর।

বরগুনা জেলার প্রাথমিক শিক্ষার বেহাল অবস্থা নিয়ে নানা রকম অভিমত রয়েছে। অভিভাবকরা বলছেন– শিক্ষকদের আন্তরিকতার অভাব এবং নিয়মিত বিদ্যালয় গিয়ে পাঠদান না করানোর কারণেই শিক্ষা ক্ষেত্রে এমন নৈরাজ্য। তবে শিক্ষকদের দাবি, অভিভাবকদের অসচেতনতা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেশি হওয়ায় ছাত্র-ছাত্রী পাওয়া যাচ্ছে না। তবে সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকট থেকে সন্তানদের কিন্ডারগার্টেনে পাঠাচ্ছেন অভিভাবকরা।

বরগুনা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্যমতে, এক হাজার ৮২৩ দশমিক ৮৭ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই জেলায় লোকসংখ্যা ১০ লাখ ১০ হাজার ৫৩১ জন। সরকারি-বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এক হাজার ৪৫টি। যার মধ্যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ৭৯৯টি। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৮১ হাজার ৯০০ জন। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের জরিপ অনুযায়ী, শিক্ষার্থী উপস্থিতির হার ৮৭ দশমিক ৬৫ শতাংশ। শিক্ষকের পদ রয়েছে পাঁচ হাজার ৪৭টি। যার মধ্যে শূন্যপদ রয়েছে ৪৯৮টি। সেই হিসাবে কর্মরত একজন শিক্ষকের অনুকূলে শিক্ষার্থী থাকার কথা ১৮-১৯ জন। একটি বিদ্যালয়ে গড় শিক্ষার্থী থাকার কথা অন্তত ১০৪-১০৫ জন। তবে সরকারি নিয়মে একজন শিক্ষকের বিপরীতে শিক্ষার্থী থাকা প্রয়োজন অন্তত ৩০ জন।

বাস্তব চিত্র পুরোই উল্টো। গত ২৭ জুলাই দুপুরে বরগুনা সদর উপজেলার মধ্য পাঠাকাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, দুজন শিক্ষার্থী বারান্দার ঘোরাঘুরি করছে। লাইব্রেরিতে বসে আছেন কর্মরত পাঁচ শিক্ষকের মধ্যে তিনজন। উপস্থিত নেই প্রধান শিক্ষক অথবা ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক। ফাঁকা পড়ে আছে শ্রেণিকক্ষের চেয়ার-টেবিল।

এমন পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিলেন সহকারী শিক্ষক কামরুন নাহার। তিনি বলেন, বিদ্যালয়ের ক্যাচমেন্ট এরিয়ায় (শিক্ষাসেবা এলাকা) শিক্ষার্থী কম এবং অনেকে শহরে গিয়ে লেখাপড়া করে। তাছাড়া যোগাযোগ ব্যবস্থা খারাপ থাকায় শিশুরা স্কুলে কম আসে। প্রধান শিক্ষক ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের অনুপস্থিতির বিষয়ে তিনি বলেন, প্রধান শিক্ষক অসুস্থ এবং ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ছুটিতে আছেন।

এখান থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে চড়পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সেখানে বারান্দায় ঘোরাঘুরি করছে পাঁচ শিক্ষার্থী। ছিলেন দুই নারী শিক্ষক। উপস্থিত পাওয়া যায়নি প্রধান শিক্ষককে। সহকারী শিক্ষক পারভীন আক্তার জানান, শিক্ষার্থী কম থাকা তাদের জন্যও বিব্রতকর। তাঁর দাবি, কাছাকাছি মাদ্রাসা ও কিন্ডারগার্টেন থাকার কারণে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমে যাচ্ছে। তবে একাধিক অভিভাবকের দাবি, শিক্ষকরা নিয়মিত স্কুলে না আসায় এবং আন্তরিকতার সঙ্গে পাঠদান না করার কারণেই শিক্ষার্থীরা অন্যত্র চলে যাচ্ছে।

প্রধান শিক্ষক বশির উদ্দীন জানান, তিনি অসুস্থ থাকায় বেশ কিছুদিন ছুটিতে আছেন। পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থী কমে যাচ্ছে বলে দাবি তাঁর।

 

আরও বিস্তারিত জানতে গত ৩০ জুলাই বেতাগী উপজেলার পূর্ব হোসনাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যান এই প্রতিবেদক। তিনি দেখতে পান, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক একটি ফাঁকা শ্রেণিকক্ষে বেঞ্চের ওপর ঘুমিয়ে আছেন। অন্য শিক্ষকের মাধ্যমে সাংবাদিকদের উপস্থিতির কথা শুনে তড়িঘড়ি করে উঠে যান তিনি। এই বিদ্যালয়ে চারজন শিক্ষকের মধ্যে উপস্থিত পাওয়া যায় দুজনকে। তবে শিক্ষক হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর ছিল চারজনেরই। একটি কক্ষে তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির পাঁচ শিক্ষার্থীকে নিয়ে বসে থাকতে দেখা যায় এক নারী শিক্ষককে। তার শিশু সন্তানকেও দেখা যায় সেখানে।

বিদ্যালয়টির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নাজমা আক্তারের ভাষ্য, বিদ্যালয় এরিয়ায় মোট শিক্ষার্থী রয়েছে ২০ জন। তারা এই বিদ্যালয় ভর্তি হলেও সবাই নিয়মিত আসছে না। শিক্ষার্থীদের পাঠদান রেখে ঘুমের বিষয়ে তিনি বলেন, শারীরিক অসুস্থতার কারণে কিছু সময়ের জন্য ঘুমিয়ে ছিলেন। অন্য দুই শিক্ষক উপস্থিত না থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, এক আত্মীয় মারা যাওয়ায় তারা সেখানে গিয়েছেন।

এদিকে, ৫০ জনের কম শিক্ষার্থী থাকা ২৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে পাশের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত করতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছেন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা। যার মধ্যে রয়েছে পাথরঘাটা উপজেলার ১০টি, বেতাগী উপজেলার ১৩টি এবং বরগুনা সদর, আমতলী, তালতলী ও বামনা উপজেলার একটি করে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবু জাফর মো. ছালেহ্ বলেন, জেলার শিক্ষার্থী অনুপাতে বিদ্যালয়ের সংখ্যা বেশি হয়ে যাওয়ায় অনেক বিদ্যালয়ে আশানুরূপ শিক্ষার্থী পাওয়া যাচ্ছে না। তারপরও বিদ্যালয়ের ক্যাচমেন্ট এরিয়ার শিক্ষার্থীরা যাতে ওই বিদ্যালয়ে ভর্তি হন, সে বিষয়ে শিক্ষকদের মাধ্যমে অভিভাবক সমাবেশ, বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের বোঝানোসহ নানা কার্যক্রম চলছে।

বরগুনা জেলা প্রশাসক মিজ তাছলিমা আক্তারের ভাষ্য, শিক্ষার গুণগত মানও নিশ্চিত হচ্ছে না, শিক্ষকদের অনাগ্রহ পরিলক্ষিত হচ্ছে। তাই সামগ্রিক বিষয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের নিয়ে মতবিনিময় সভা করা হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষাকে মানসম্মত করার লক্ষ্যে নানা চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন
সম্পাদকঃ শিকদার মাহবুব