বরিশালে অর্থের বিরোধে নারী নির্যাতন মামলা !

আপডেট: September 16, 2026

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক ::: বরিশাল মেট্রোপলিটন কোতয়ালী মডেল থানায় দায়ের করা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের একটি মামলার অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মামলার আসামি শাফিন আহমেদ ও তার বাবা এনায়েত হোসেন মনির। তাদের দাবি, অর্থ আত্মসাতের অভিযোগকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে শাফিন আহমেদের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের মামলা করা হয়েছে। মামলার অভিযোগ তারা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন।

কোতয়ালী মডেল থানার মামলা নম্বর-২৬, তারিখ ৭ আগস্ট ২০২৬। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ৯(৪)(খ) ধারায় মামলাটি দায়ের করেন অন্তরা রানী দাস। মামলায় একমাত্র আসামি করা হয়েছে শাফিন আহমেদকে।Legal

মামলার এজাহারে বাদী অভিযোগ করেন, তিনি শাফিন আহমেদের বাবা এনায়েত হোসেন মনির পরিচালিত চেতনা মহিলা উন্নয়ন সংস্থায় মাঠকর্মী হিসেবে চাকরি করতেন। চাকরি ছাড়ার পর তার কয়েক মাসের বেতন পাওনা ছিল। ওই পাওনা টাকা আদায়ের জন্য তিনি বিভিন্ন সময় এনজিও কার্যালয়ে যাতায়াত করতেন। এজাহারে আরও অভিযোগ করা হয়, ৩০ জুলাই ২০২৬ দুপুর ৩টার দিকে শাফিন আহমেদ তাকে পাওনা বেতনের টাকা দেওয়ার কথা বলে অফিসে ডেকে নেন। সেখানে তাকে একা পেয়ে শারীরিকভাবে হেনস্তার চেষ্টা করা হয় এবং বাধা দিলে হত্যার হুমকি দেওয়া হয় বলে বাদী অভিযোগ করেন।

তবে মামলার অভিযোগের বিষয়ে ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন আসামি শাফিন আহমেদ ও তার বাবা এনায়েত হোসেন মনির। তাদের দাবি, অন্তরা রানী দাসের সঙ্গে পাওনা টাকা এবং হিসাব-নিকাশ নিয়ে আগে থেকেই বিরোধ চলছিল। সেই বিরোধের ধারাবাহিকতায় তাদের পরিবারকে হয়রানি করার উদ্দেশ্যে শাফিনের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের মামলা করা হয়েছে।

মামলার এজাহারে সাতজন সাক্ষীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে প্রথম সাক্ষী মো. মিলন হাওলাদার ও চতুর্থ সাক্ষী গৌতম চন্দ্র রায় ঘটনার পরপরই ঘটনাস্থলে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন।

মিলন হাওলাদারের বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনার সময় তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না। তার ভাষ্য, অন্তরা রানী দাস ফোন করে কান্নাকাটি করে তাকে সাহায্যের জন্য অনুরোধ করলে তিনি গৌতম চন্দ্র রায়ের সঙ্গে চেতনা মহিলা উন্নয়ন সংস্থার অফিসে যান। সেখানে গিয়ে তিনি অন্তরার কাছ থেকে ঘটনার বর্ণনা শোনেন।

অর্থাৎ, তার নিজের বক্তব্য অনুযায়ী তিনি কথিত ঘটনার সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না।

চতুর্থ সাক্ষী গৌতম চন্দ্র রায়কেও এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনিও জানান, তিনি ঘটনার পর সেখানে যান। ঘটনার সময় অফিসে কোনো প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন কি না, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিতভাবে বলতে পারেননি। তবে অফিসের একজন কর্মকর্তা সেখানে ছিলেন বলে শুনেছেন বলে জানান তিনি।

এ প্রতিবেদনের অনুসন্ধানের সময় ওই কর্মকর্তার নাম জানতে চাওয়া হলে তাৎক্ষণিকভাবে তার নাম নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। মামলার বাদীর কাছেও এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি কথিত প্রত্যক্ষদর্শীর নাম স্মরণ করতে পারেননি বলে প্রতিবেদকের কাছে দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে মামলার সাত সাক্ষীর তালিকাতেও ওই ব্যক্তির নাম নেই।

মামলার দ্বিতীয় সাক্ষী শংকর চন্দ্র মন্ডলের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তৃতীয় সাক্ষী ময়না বেগমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ঘটনার সময় তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন না। তিনি তখন ঢাকায় ছিলেন। পরবর্তীতে অন্তরা রানী দাসের কাছ থেকে ঘটনার কথা শুনেছেন বলে জানান তিনি।

ময়না বেগম আরও জানান, অন্তরা রানী দাসের বেতন পাওনা থাকার বিষয়টি তিনি জানতেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, এনায়েত হোসেন মনিরও পাওনা থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছিলেন এবং মাঠপর্যায়ের হিসাব বুঝিয়ে দেওয়ার পর বেতন পরিশোধের কথা জানিয়েছিলেন।

মামলার পঞ্চম ও ষষ্ঠ সাক্ষী গোলাম মোস্তফা ও দুলাল মৃধার সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

মামলার সপ্তম সাক্ষী মাসুমা আক্তারের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য মামলার কাগজপত্রে উল্লেখিত ঝাউতলার ঠিকানায় গিয়ে তার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়। প্রথমে তিনি বাসায় থাকার কথা জানালেও মামলার বিষয়ে সরাসরি কথা বলার আগ্রহের কথা জানানো হলে পরে তিনি বাসায় নেই বলে জানান।

মামলার বিষয়ে বাদীর সঙ্গে কথা না বলে তিনি কোনো বক্তব্য দিতে পারবেন না বলেও জানান।

আসামিপক্ষের দাবি, নারী নির্যাতন মামলার আগে অন্তরা রানী দাসের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করা হয়।

মামলার নথি অনুযায়ী, এনায়েত হোসেন মনির বাদী হয়ে অন্তরা রানী দাসের বিরুদ্ধে বরিশালের আদালতে সি.আর. মামলা নম্বর ৩৬৪/২০২৬, তারিখ ৩ আগস্ট ২০২৬ দায়ের করেন। এতে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে।Geographic Reference

এর আগে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে পাওনা টাকা ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করে ২ জুলাই ২০২৬ তারিখে এনায়েত হোসেন মনির কোতোয়ালি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন।

অর্থাৎ, জিডি, পরবর্তী অর্থ আত্মসাতের মামলা এবং তার কয়েকদিন পর শাফিন আহমেদের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের মামলা দায়েরের ঘটনা একই বিরোধের ধারাবাহিকতায় ঘটেছে।

এনায়েত হোসেন মনির বলেন, অন্তরা রানী দাস তাদের প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। চাকরির সময়ের হিসাব-নিকাশ ও অর্থ সংক্রান্ত বিষয়ে বিরোধ তৈরি হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এরপরই তার ছেলে শাফিন আহমেদের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের মামলা করা হয়েছে।

তার দাবি, “আমার ছেলের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। অর্থ সংক্রান্ত বিরোধের কারণে আমাদের পরিবারকে চাপের মধ্যে ফেলতে ও হয়রানি করতে এই মামলা করা হয়েছে। তদন্তে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে।”Legal

অভিযুক্ত শাফিন আহমেদ বলেন, মামলায় যে ঘটনার কথা বলা হয়েছে সেটি মিথ্যা বলে তিনি অস্বীকার করেন এবং অভিযোগটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন।তবে মামলার বাদী অন্তরা রানী দাস মামলায় উল্লেখিত ঘটনা হুবহু বলেই বক্তব্য দেন।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই ইস্তিয়াক বলেন- এখনও তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষে সত্যতা বলতে পারবো।মামলা দায়ের হওয়া মানেই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া নয়। আদালতে সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারিত হবে। একইভাবে সাক্ষীদের কেউ ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না বলে যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেটিও মামলার অন্যান্য প্রমাণের সঙ্গে মিলিয়ে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় মূল্যায়ন করার দাবি করেন ভুক্তভোগীরা।

উল্লেখ্য, এনায়েত হোসেন মনির ও অন্তরা রানী দাসের ভিতরে চলা দন্দের বিষয়ে একাধিকবার পুলিশ, এডভোকেট, স্থানীয়রা মিমাংশা করে দিলেও এনায়েত হোসেন মনিরের দাবি বিভিন্ন মামলা দিয়ে হয়রানি করছেন অন্তরা রানী দাস।

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন
সম্পাদকঃ শিকদার মাহাবুব