আপডেট: June 19, 2024
আপডেট:
স্টাফ রিপোর্টার::বরিশালে মৎস্য সম্পদ ধংসকারীদের যদি তালিকা করা হয় সেই তালিকায় অগ্রভাগে থাকবে উত্তর আমানতগঞ্জ সিকদারপাড়া এলাকার বিএনপি নেতা কালু সিকদার, যিনি চাপিলা, জাটকাসহ চিংড়ি রেণুপোনা পাচারের মূলহোতা। এই ব্যক্তি এবং তার গোটা পরিবার স্বাধীনতাবিরোধী জামাত-বিএনপির রাজনীতির সাথে দীর্ঘদিন ধরে সম্পৃক্ত থাকলেও তিনি হঠাৎই নিজেকে মস্তবড় আওয়ামী লীগার দাবি করলেন। স্থানীয় বাসিন্দা পেশায় সাংবাদিক মাহাবুব সিকদারসহ তার বাবা ভাইদেরকে মারধর করা শেষে কালু নিজের বাসা এলোমেলা করে ডাকাতি নাটক সাজিয়ে এবং কথিত মিডিয়াকর্মীদের ভাড়া করে নিয়ে তা প্রচার করে পুলিশ প্রশাসন ও রাজনৈতিক মহলের সহানুভুতি পাইতে চাইছে। সাজানো সেই ভিডিওতে তার জামাতা তুহিন নিজেকে আওয়ামী লীগ দাবি করলেও সিডা কালুর পরিবারটি বিএনপি ঘরনার হিসেবে সমাধিক পরিচিত।
স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র এবং ৪ নং ওয়ার্ড বিএনপির দায়িত্বশীল কয়েকজন নেতা স্বীকার করেছেন কালু সিকদার, তার চাচাতো ভাই নিজাম সিকদার, মামুন সিকদার এবং মিরাজ সিকদার বিএনপির ওয়ার্ডপর্যায়ের নেতা-কর্মী। এমনকি তারা বিএনপি হিসেবে পরিচিত হলেও সাবেক মেয়র মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ’র ক্ষমতার আমলে এলাকায় চোরা কারবার থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের ওপর ব্যাপক অত্যাচার নিপীড়ন চালিয়েছে। তাদের এই অপকর্মে রাজনৈতিক শেল্টার দিয়েছেন, দিচ্ছেন সাদিকপন্থী ওয়ার্ড যুবলীগ সাধারণ সম্পাদক মজিবর। সর্বশেষ ঈদের দুদিন আগে এই গ্রুপটি স্থানীয় বাসিন্দা সাংবাদিক সিকদার মাহাবুব এবং তার বাবাসহ ভাইদের রাস্তার ওপর ফেলে পিটিয়েছে। এবং কালু তার নিজের বাসার মালামাল এলোমেলা করে ডাকাতির নাটক সাজিয়ে এখন গোটা পরিবারকে আ’লীগ দাবি করছে।
একটি সূত্র জানিয়েছে, স্থানীয় বিতর্কিত সিডা পরিবারটি বিএনপির রাজনীতি করলেও তারা ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে পছন্দ করে। বিশেষ করে কালুর সাথে কাউনিয়া থানা পুলিশের রয়েছে গভীর সখ্যতা। তালতলী মৎস্য বন্দর থেকে অবৈধভাবে চাপিলা, জাটকা রেণুপোনা পাচার করে অর্জিত অর্থের একটি অংশও কাউনিয়া থানা পুলিশের ওসি মো. আসাদুজ্জামানকে উৎকোচ হিসেবে দেন, যার বদৌলতে কালুর রয়েছে থানায় যাতায়াত। অবশ্য এনিয়ে থানা পুলিশের মধ্যে নানা আলোচনা হয়। কিন্তু ওসির কাছের লোক হওয়ায় অপরাপর কর্মকর্তারা বিষয়টি নিয়ে মুখ খোলার সাহস দেখায় না। যদিও ওসি আসাদুজ্জামান বিএনপিপ্রীতির এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এবং বলছেন, কালু বিএনপি করে বিষয়টি জানা ছিল না।
স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, এই সিডা পরিবার তৎকালীন বিএনপি জামাতের আমলে উত্তর আমানতগঞ্জে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। কালু, নিজাম, মাছুম এবং মিরাজসহ ১০ জনের একটি বাহিনী ওই সময় উত্তর আমানতগঞ্জ, বেলতলা থেকে শায়েস্তাবাদ পর্যন্ত সন্ত্রাস চালিয়েছে।
বিস্ময়কর বিষয় হচ্ছে, এই কালু, নিজামের ছোট ভাই মাছুম ওরফে সিডা মাসুম এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করাসহ সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চালাতে গিয়ে প্রতিপক্ষের হাতে খুন হয়। তকে কুপিয়ে হত্যা এবং একটি হাত কেটে নিয়ে মহাবাজ শফি মিয়ার গ্রেজস্থ ধানক্ষেতে ফেলে রাখা হয়। মজার বিষয় হচ্ছে, মাছুম হত্যাকান্ডে যাদের অভিযুক্ত করা হয়েছিল, সেই মিরাজ, নয়ন এবং সেলিমদের নিয়েই চলছে এখন বিএনপি নেতা কালুর চোরা কারবারি এবং ত্রাসের রাজত্ব।
উচ্চশিক্ষিত একজন তরুণ সাংবাদিক এবং তার বাবাকে রাস্তায় প্রকাশ্যে পিটুনি দেওয়ার এত সাহস বা শক্তি কালু-মিরাজ কোথায় পেলো তার উত্তর খুঁজতে গিয়ে চোখ কপালে ওঠার জোগার। জানা গেছে, সিডা কালুর পরিবারটি বিএনপি হলেও সে সবাইকে নিয়ে এখন আ’লীগের ঘাড়ে বসে আছে! নিরীহ এলাকাবাসীর ওপর ঘোরাচ্ছে ছড়ি! এক্ষেত্রে সে কাউনিয়া থানা পুলিশকে ব্যবহার করে চলছে। মারধরের পর সাংবাদিক মাহাবুবের বাবার একমাত্র দোকানটিতেও তালা মেরে দেয় কালুসহ তার সাঙ্গপাঙ্গরা। এবং নিজের বাসার মালামাল এলোমেলো করে ডাকাতির নাটক সাজিয়ে পুলিশ ও সংবাদকর্মীদের খবর দেয়।
সেই চিত্রের ভিডিও ধারণ করে সাদিক অনুসারীরা মৎস্যজীবী লীগ নেতা খান হাবিবের দিকে আঙ্গুল তোলে। অবশ্য বিএনপি নেতা কালুর জামাতাকে সেই ভিডিওতে মেয়র আবুল খায়ের আব্দুল্লাহপন্থী রাজনৈতিক হাবিবকে নিয়ে ‘খিস্তিখেউর’ করতে শোনা যায়। জানা গেছে, এনিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা-সমালোচনা হয়, হচ্ছে এবং মেয়র অনুসারীদের সংক্ষুব্ধ করে তুলেছে।
স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, এই চক্রটি তালতলী বন্দরে চোরা কারবারি করে ইতিমধ্যে কোটি কোটি টাকা কামিয়ে নিয়েছে। মূলত তার কারণে তারা কাউকে ‘থোরাও কেয়ার’ করে। বলা বাহুল্য যে কালুর ভাই নিজাম এবং সাদিকপন্থী যুবলীগ নেতা মজিবর বছর দুয়েক আগে এক ট্রাফিক সার্জেন্টকে এলাকার রাস্তায় প্রকাশ্যে পিটিয়ে রক্তাক্ত করে। সেই ঘটনায় তাদের দুজনকে কাউনিয়া থানা পুলিশ গ্রেপ্তার করে কারাগারেও পাঠিয়েছিল। তাছাড়া সিডা মামুন সময় টিভির ব্যুরো প্রধান অপূর্ব অপুকে অপহরণ চেষ্টা এবং মারধর করে। সেই ঘটনায় সাংবাদিক সমাজের আন্দোলন এবং পত্র-পত্রিকার শিরোনাম হয় সিডা মামুন। পরে পুলিশ তাকেসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠিয়ে দেয়। এলাকাবাসী জানিয়েছে, এই মামুন বিএনপির ক্ষমতার আমলে মাদক ক্রয়-বিক্রয়সহ চুরি ছিনতাইয়ে জড়িত ছিল, আছে।
এমন কয়েকজন লোক নিরব হোসেন টুটুলের ছত্রছায়ায় শান্তির জনপদ উত্তর আমানতগঞ্জে ক্রমাগতভাবে হিংসা ছড়ানোসহ অবৈধ পথে অর্থ ইনকাম করতে গিয়ে একের পর এক সন্ত্রাস সৃষ্টি করে চলছে। বিশেষ করে এলাকার সন্তান সাংবাদিক মাহাবুবকে মারধর এবং বিএনপি নেতা কালু তার বাসায় ডাকাতির নাটক সাজানোর বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় সুশীলমহল তাদের ওপর সংক্ষুব্ধ। কিন্তু তাদের দাপটের কারণে অনেকেই মুখ খোলার সাহস শক্তি দেখাতে পারছেন না। কারণ এই অশুভ সিন্ডিকেটের সাথে থানা পুলিশের ওসি আসাদুজ্জামানের গভীর সখ্যতার স্থানীয় বাসিন্দাদের মুখে মুখে।
কাউনিয়া থানা পুলিশের বিএনপিপ্রীতি নিয়ে ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ জনপ্রতিনিধিরাও তিক্ত-বিরক্ত। এতদিন এই সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কেউ মুখ না খুললেও সাংবাদিক এবং তার বৃদ্ধ পিতাকে মারধর করে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান তালাবদ্ধ করে রাখার ঘটনায় চরম ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। ঘটনার দুদিন বাদে কাউনিয়া থানা পুলিশের এসআই আরাফাত হাসানস তালা ভেঙে দোকানটি খুলে দিয়েও সাংবাদিক পরিবারটি স্বস্তিতে নেই, তাদের খুন-জখমের হুমকি অব্যাহত রেখেছে কালু, মিরাজ এবং নিজামসহ ৯/১০ জনের বাহিনী। তাদের এই অনাচার রোধে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার জিহাদুল কবিরের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এলাকাবাসী। এক্ষেত্রে শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তার ভাষ্য হচ্ছে, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি মোটেও ওয়াকিবহাল ছিলেন না, এমনকি থানা পুলিশও তাকে কিছু অবহিত করেনি। তবে তিনি আশ্বস্ত করেছেন, খোঁজ নিয়ে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখবেন এবং ব্যবস্থাও গ্রহণ করবেন।
পুলিশ কমিশনারের এমন অভিব্যক্তি এবং পরবর্তী পদক্ষেপ আসলে উত্তর আমানতগঞ্জের ওই চোরা কারবারিদের জন্য সমূহবিপদ বয়ে আনতে পারে। পাশাপাশি তাদের সাথে জড়িত পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও আসতে পারে শাস্তির খড়গ! কারণ সৎ এবং স্বচ্ছ পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে খ্যাতিপ্রাপ্ত জিহাদুল কবির বিতর্কের উর্ধ্বে থাকতে পছন্দ করেন। এবং কোনো মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্য অপরাধ করেছে, তার বিরুদ্ধে তিনি ব্যবস্থাগ্রহণ করেননি এমন উদাহরণ নেই। ক্ষেত্রে কাউনিয়া থানা পুলিশের কেউ যদি এই অপরাধী চক্রটিকে কোনোরুপ সহায়তা দিয়ে থাকেন, আর যদি প্রমাণ মেলে তাহলে কর্মক্ষেত্রে তাকে শাস্তির মুখোমুখি হতেই হবে।’






