নারী-শিশু সুরক্ষায় করণীয়…….

আপডেট: September 15, 2026

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন

নাজনীন শবনম::

নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতাকে আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ধর্ষণ, দলবদ্ধ ধর্ষণ, হত্যা, যৌন হয়রানি, শারীরিক নির্যাতন, অপহরণ ও শিশুর ওপর যৌন সহিংসতার খবর নিয়মিত সামনে আসছে। প্রতিটি ঘটনার পর সামাজিক ক্ষোভ তৈরি হয়; আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান চালায়; অভিযুক্ত গ্রেপ্তার হন; মামলা এবং বিচার শুরু হয়। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, আমরা কি সত্যিই অপরাধ প্রতিরোধ করতে পারছি, নাকি অপরাধ ঘটে যাওয়ার পর শুধু ব্যবস্থা নিচ্ছি?

এ প্রশ্নের উত্তর শুধু গ্রেপ্তার বা শাস্তির সংখ্যায় পাওয়া যাবে না। জানতে হবে– অপরাধ কেন ঘটছে; কারা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে; কোন পরিস্থিতিতে অপরাধের সুযোগ তৈরি হচ্ছে এবং ঘটনার আগে কোনো সতর্ক সংকেত ছিল কিনা। একই সঙ্গে দেখতে হবে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সেই সংকেত কতটা গুরুত্ব দিয়ে মোকাবিলা করেছে।

মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন-এমএসএফের আগস্ট ২০২৬-এর মনিটরিং প্রতিবেদন এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিত্র দিয়েছে। আগস্টে নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার নথিভুক্ত ঘটনা ৩২৭টি; নারী ও শিশু হত্যা ৯১টি; দলবদ্ধ ধর্ষণ ১২টি এবং ধর্ষণ ও হত্যা পাঁচটি; আত্মহত্যা ৩৯টি।

নথিভুক্ত অপরাধ সমাজে সংঘটিত সব অপরাধের পূর্ণ চিত্র নয়। বিশেষ করে ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, পারিবারিক সহিংসতা ও শিশুর যৌন নির্যাতনের অনেক ঘটনা সামাজিক লজ্জা, পরিবারের চাপ, অর্থনৈতিক নির্ভরতা, প্রতিশোধের ভয়, স্থানীয় প্রভাব বা বিচার না পাওয়ার আশঙ্কায় প্রকাশ্যে আসে না। তাই অপরাধের নথিভুক্ত সংখ্যা কমলে সরাসরি ধরে নেওয়া যায় না, অপরাধও কমেছে। অভিযোগ করার সুযোগ, প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা এবং বিচার পাওয়ার বাস্তব সুযোগও বিবেচনায় নিতে হবে।

নারী ও শিশুর সুরক্ষায় দৈনন্দিন কার্যক্রমতত্ত্বও গুরুত্বপূর্ণ। এই তত্ত্ব বলে, অপরাধের সুযোগ তৈরি হতে পারে যখন অপরাধপ্রবণ ব্যক্তি, ঝুঁকিতে থাকা ভুক্তভোগী এবং কার্যকর তত্ত্বাবধানের অভাব একই পরিস্থিতিতে থাকে। এখানে ভুক্তভোগীর কোনো দায় নেই। অপরাধের দায় সম্পূর্ণ অপরাধীর। তবে নিরাপদ পরিবেশ, নজরদারি, দ্রুত অভিযোগের ব্যবস্থা এবং ঝুঁকিতে থাকা মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যমে অপরাধের সুযোগ কমানো সম্ভব।

কার্যকর তত্ত্বাবধান শুধু পুলিশের দায়িত্ব নয়। পরিবার, শিক্ষক, প্রতিবেশী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, স্থানীয় সমাজ, প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থারও ভূমিকা রয়েছে। কোনো নারী বারবার হুমকি পাওয়ার পরও নিরাপত্তা না পেলে; কোনো শিশু নির্দিষ্ট ব্যক্তির কাছে যেতে ভয় পাওয়ার পরও বিষয়টি উপেক্ষা করা হলে বা দীর্ঘদিনের পারিবারিক সহিংসতাকে ‘সংসারের বিষয়’ বলে এড়িয়ে গেলে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার ব্যর্থতা তৈরি হয়।

নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতার কারণ বুঝতে নারীবাদী অপরাধবিজ্ঞানও গুরুত্বপূর্ণ। এই দৃষ্টিভঙ্গি দেখায়– নারী ও শিশুর ঝুঁকিকে শুধু ব্যক্তিগত দুর্বলতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। ক্ষমতার অসমতা, অর্থনৈতিক নির্ভরতা, পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা, বৈষম্য এবং দুর্বল সামাজিক প্রতিষ্ঠান তাদের ঝুঁকি বাড়ায়। অপরাধের দায় কখনও ভুক্তভোগীর নয়। বরং দেখতে হবে কোন সামাজিক কাঠামো তাকে দীর্ঘ সময় ঝুঁকিতে রাখে এবং কেন সময়মতো সুরক্ষা দেওয়া যায়নি।

এ কারণে অপরাধ ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি আগের সতর্ক সংকেত শনাক্ত করা জরুরি। নিয়মিত হুমকি, অনুসরণ, মারধর, নিয়ন্ত্রণ বা আগের সহিংসতার ইতিহাস ভবিষ্যৎ গুরুতর সহিংসতার ইঙ্গিত হতে পারে। শিশুর আচরণে হঠাৎ বড় পরিবর্তন, নির্দিষ্ট কারও কাছে যেতে ভয় বা অস্বস্তির প্রকাশও গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। প্রতিটি সংকেত নির্যাতনের প্রমাণ নয়, তবে নিরাপত্তার প্রশ্নে এগুলো উপেক্ষা করা ঠিক নয়।

বেআইনি সালিশও বড় বাধা। ধর্ষণ, শিশুর যৌন নির্যাতনের মতো গুরুতর অপরাধকে টাকা, বিয়ে, জরিমানা, সামাজিক চাপে মীমাংসার চেষ্টা আইনের শাসনকে দুর্বল করে এবং অপরাধীকে জবাবদিহি এড়ানোর সুযোগ দেয়। এতে ভুক্তভোগী মূল অপরাধের পর দ্বিতীয় দফা সামাজিক চাপ, অপমান ও ভয়ভীতির মুখে পড়েন। অপরাধ নিয়ন্ত্রণের দর্শনে তাই শুধু গ্রেপ্তার নয়; ন্যায্য বিচারের মাধ্যমে শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি অপরাধ প্রতিরোধেও গুরুত্ব দিতে হবে। দেখতে হবে কতজন ঝুঁকিপূর্ণ মানুষ নিরাপত্তা পেয়েছেন; কতজন ভুক্তভোগী ন্যায়বিচার পেয়েছেন এবং অপরাধের পুনরাবৃত্তি কতটা কমেছে। অভিযোগ, তদন্ত, বিচার ও রায়ের প্রতিটি ধাপ কার্যকর, নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক হতে হবে।

আমার মতে, অপরাধ শুধু ব্যক্তির বিচ্যুতি নয়। এর সঙ্গে সামাজিক কাঠামো, ক্ষমতার অসমতা, পারিবারিক পরিবেশ ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাও জড়িত। তাই অপরাধ দমনে শুধু শাস্তি নয়; অপরাধের কারণ ও তা সংঘটনের পথ রুদ্ধ করার দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে আইনসম্মত, প্রমাণভিত্তিক ও মানবাধিকারসম্মত উপায়ে।

নিরাপদ সমাজ শুধু সেই সমাজ নয়, যেখানে অপরাধের পর অপরাধী ধরা পড়ে। বরং সেই সমাজ, যেখানে অপরাধ ঘটার আগেই ঝুঁকি চিহ্নিত করা যায়; সতর্ক সংকেত গুরুত্ব পায়; ভুক্তভোগী সুরক্ষা পান এবং আইনের শাসন নিশ্চিত হয়।

নাজনীন শবনম: পিএইচডি গবেষক, অপরাধবিজ্ঞান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন
সম্পাদকঃ শিকদার মাহাবুব