আপডেট: September 23, 2026
বিশেষ প্রতিনিধি:::
আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেস ফাইভারে প্রতারণার জাল ছড়িয়ে দেশের সুনাম করছে একটি চিহ্নিত চক্র। নিজে কাজ না পেলে প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্রিল্যান্সারদের র্যাংকিং ক্ষতিগ্রস্ত করার মিশনও চালায় চক্রটি।
Shares
facebook sharing buttontwitter sharing buttonwhatsapp sharing buttonmessenger sharing buttonprint sharing buttoncopy sharing button নামে-বেনামে শত শত ফেক ও ডামি অ্যাকাউন্ট খোলা হচ্ছে। চাকরি দেওয়ার নামে পাসপোর্ট-এনআইডি জব্দ করে অ্যাকাউন্ট খুলে রমরমা ব্যবসা চালানো হচ্ছে। আবার প্রতিদ্বন্দ্বীকে ঘায়েলে করতে সেসব অ্যাকাউন্ট থেকে ভুয়া কাজের অর্ডার দেওয়া হয়। পরে ইচ্ছাকৃত রিফান্ড করা হয়। দেওয়া হয় নেতিবাচক রিভিউ। এভাবে ফ্রিল্যান্সিংয়ে ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্নকে পুঁজি করে ‘স্ক্যামিং’ নেটওয়ার্ক চালানো হচ্ছে।
Advertisement
ডিজিটাল দুনিয়ায় এমন ভয়াবহ অনিয়ম ও স্ক্যামের চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে যুগান্তরের মাসব্যাপী অনুসন্ধানে। এ চক্রের অন্যতম হোতা বেটোপিয়া গ্রুপের সিইও মনির হোসেন। গত জুলাইয়ের শেষের দিকে বেটোপিয়া সংশ্লিষ্ট তিন শতাধিক অ্যাকাউন্ট একযোগে বাতিল (সাসপেন্ড) করে ফাইভার কর্তৃপক্ষ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সিং খাতের সুনাম ক্ষুণ্ন হবে। একইসঙ্গে ফ্রিল্যান্সিংয়ে তরুণদের আগ্রহ ও আস্থায় ভাটা পড়বে। নেতিবাচক প্রভাব পড়বে কর্মসংস্থানেও।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কন্ট্যাক্ট সেন্টার অ্যান্ড আউটসোর্সিংয়ের (বাক্কো) সাধারণ সম্পাদক ফয়সাল আলীম যুগান্তরকে বলেন, ‘ফ্রিল্যান্সিং প্ল্যাটফর্মে ফেক অ্যাকাউন্ট, ভুয়া অর্ডার বা প্রতিদ্বন্দ্বীর গিগ ক্ষতিগ্রস্ত করার মতো কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। চাকরি দেওয়ার নামে ব্যক্তিগত পরিচয়পত্র সংগ্রহ এবং ব্যবহার করে অ্যাকাউন্ট খুলে তা অনৈতিক কাজে ব্যবহার করা অত্যন্ত গুরুতর। এ ধরনের কর্মকাণ্ড দেশের পুরো ফ্রিল্যান্সিং খাতের ওপর আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এসব স্ক্যামারের বিরুদ্ধে তদন্তসাপেক্ষে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একইসঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট শিল্প সংগঠনগুলোরও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত। কারো অনৈতিক কর্মকাণ্ডের দায় যেন দেশের লাখো সৎ ফ্রিল্যান্সারের ওপর না পড়ে এ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
ফাইভার তাদের ফোরামের বাংলাদেশ বিভাগে ‘সুষ্ঠুতা ও সততা নিশ্চিতকরণ : সমন্বিত অ্যাকাউন্ট ম্যানিপুলেশন (বা জালিয়াতি) সংক্রান্ত হালনাগাদ তথ্য’ শিরোনামে একটি বিশেষ নোটিশ জারি করে। এতে অন্যের পরিচয় ব্যবহার করে অ্যাকাউন্ট পরিচালনা, ভুয়া রিভিউ ও সমন্বিত উপায়ে মার্কেটপ্লেসের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করার বিরুদ্ধে জিরো-টলারেন্সের কথা স্পস্ট জানিয়ে দেয় প্রতিষ্ঠানটি।
তথ্যানুসন্ধানে বেটোপিয়া গ্রুপ ঘিরে স্ক্যাম নেটওয়ার্কের তথ্য বেরিয়ে এসেছে। বিভিন্ন সময় ভিন্ন ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে আকর্ষণীয় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে চাকরিপ্রার্থীদের আকৃষ্ট করা হয়। চাকরিতে যোগদানের সময় কর্মীদের পাসপোর্ট ও জাতীয় পরিচয়পত্র নেওয়া হয়। অভিযোগ, কর্মীদের অজান্তে তাদের পাসপোর্টের তথ্য ব্যবহার করে অনলাইন মার্কেটপ্লেসে (ফাইভার) অ্যাকাউন্ট খোলে বেটোপিয়া গ্রুপ। এসব অ্যাকাউন্ট থেকে ক্লায়েন্টদের কাছে বার্তা পাঠানো, কাজের জন্য বিড করা এবং মার্কেটপ্লেসে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করে গ্রুপটি। অথচ যে ব্যক্তির পরিচয়ে অ্যাকাউন্ট খোলা হয় তাকে কিছুই জানানো হয় না। অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ থাকে প্রতিষ্ঠানের হাতে। ফলে প্রকৃত অ্যাকাউন্টধারীর জানার বা নিয়ন্ত্রণের সুযোগ থাকে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রতিষ্ঠানটির একাধিক কর্মী যুগান্তরকে জানান, অনিয়ম নিয়ে অফিসে একাধিকবার বিরোধিতার ঘটনা ঘটেছে। এসব অনিয়মের বিষয়ে এক কর্মী প্রশ্ন তোলায় তাকে কক্ষে আটকে রেখে মারধর করেন গ্রুপের লোকজন। সাবেক কর্মীরা জানান, বেটোপিয়া প্রতিষ্ঠার আগে একই ব্যবসা ‘বিডি কলিং আইটি’ নামে পরিচালিত হতো। মার্কেটপ্লেসের নীতিমালা লঙ্ঘনসহ বিভিন্ন অভিযোগে ওই নামের নেতিবাচক পরিচিতি তৈরি হলে পরবর্তীতে নাম পরিবর্তন করে নতুন পরিচয়ে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। নেতিবাচক ভাবমূর্তি আড়াল করে নতুন কর্মী আকর্ষণে বিভিন্ন সময়ে ফায়ার এআই, জেভি এআই, স্পার্কটেক, সফটভেন্স ও এসএম টেকসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের নামে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়।
আকর্ষণীয় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ফ্রেশারদের ‘ট্রেইনি’ বা ‘ইন্টার্ন’ হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয়। একাধিক সাবেক কর্মী জানান, এক থেকে দুই মাস কাজ করানোর পর পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই বড়সংখ্যক কর্মীকে ছাঁটাই করা হয়। কখনো ‘পারফরম্যান্স’, কখনো ‘ইভ্যালুয়েশন স্কোর’কে ছাঁটাইয়ের কারণ দেখানো হলেও মূল্যায়নের পদ্ধতি, স্কোরিংয়ের মানদণ্ড বা চাকরি হারানোর কারণ সম্পর্কে আগে থেকে জানানো হয় না।
বেটোপিয়ার সাবেক কর্মী আব্দুল্লাহ যুগান্তরকে জানান, ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার কয়েক দিন আগে আমাকে হঠাৎ পদত্যাগ করতে বলা হয়। আমার মতো আরও অনেক কর্মীকে একইভাবে চাকরি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সাবেক সফটওয়্যার প্রকৌশলী জানান, শুরুতে আমাকে ইন্টার্ন হিসাবে নেওয়া হয়। ইন্টার্নশিপ শেষে হঠাৎ মূল্যায়ন স্কোরের কথা বলে আমিসহ প্রায় সবাইকে বের করে দেওয়া হয়। পরে আমাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া মেন্টরদেরও চাকরিচ্যুত করা হয়।






